বিশেষ প্রতিনিধি, Fasih Shaiyan।।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে, যা প্রথাগত পুঁজি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অর্থনীতিকে পেছনে ফেলে "জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি"-র সূচনা করে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ কয়েক বছর আগে কোন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেছিলেন - “২০০৩-২০০৪ সালের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সাময়িকী ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসে যে, আমেরিকা বার্ষিক যে বিপুল পরিমাণ নতুন জাতীয় সম্পদ উৎপাদন করছে, তার প্রায় ৮৭% অংশই কোনো ভৌত কাঁচামাল বা খনিজ সম্পদ থেকে আসছে না; বরং তা আসছে মেধা, প্রযুক্তি, পেটেন্ট এবং উদ্ভাবন থেকে - যাকে বলা হয় "বিদ্যাজাত সম্পদ" (Knowledge-Based Wealth)। এখন যদি আমাদের দেশের শিক্ষা খাতে বাজেটের মোট বরাদ্দের ৯০% খরচ করা হয়, তাহলে কী হবে?”
যদি কোনো উন্নয়নশীল রাষ্ট্র এই বিদ্যাজাত সম্পদের অলৌকিক শক্তিকে পুরোপুরি নিজের দেশে ধারণ করতে চায়, তবে তার একমাত্র পথ হলো শিক্ষা খাতে এক বৈপ্লবিক ও চরমপন্থী বিনিয়োগ। এই নিবন্ধে আমরা অনুসন্ধান করব - বাংলাদেশ যদি তার জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ, অর্থাৎ ৯০% সরাসরি শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ করে এবং বাকি সমস্ত খাতের (অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন) জন্য মাত্র ১০% বরাদ্দ দেয় এবং এই চরমপন্থী অর্থনৈতিক অবস্থা যদি টানা ১০ বছর চলতে দেওয়া হয়, তবে বাংলাদেশের সমাজ, অর্থনীতি এবং বিশ্বমানচিত্রে কী কী আমূল ও পরাবাস্তব পরিবর্তন ঘটতে পারে।
প্রথম ৩ বছর: কাঠামোগত ধাক্কা এবং "মহাপরিবর্তনকালীন" সংকট
বাজেটের ৯০% শিক্ষা খাতে রূপান্তর করার প্রাথমিক ধাক্কাটি দেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন এবং প্রায় একটি অর্থনৈতিক সংকটের মতো হবে। যেহেতু অন্যান্য সমস্ত খাতের বাজেট মাত্র ১০%-এ নামিয়ে আনা হবে, তাই দেশটিতে নিম্নোক্ত প্রাথমিক ধাক্কাগুলো দেখা দেবে:
তবে, শিক্ষা খাতের ভেতরে যা ঘটবে:
৫ম বছর: মানবপুঁজির বিস্ফোরণ এবং 'রিভার্স ব্রেন ড্রেন'
টানা পাঁচ বছর এই নীতি চলার পর, বাংলাদেশের মানবসম্পদের গুণগত মান দক্ষিণ কোরিয়ার 'পার্ক চুং-হি' কিংবা সিঙ্গাপুরের 'লি কুয়ান ইউ'-এর শিক্ষানীতির সফলতার স্তরকেও ছাড়িয়ে যাবে।
৮ম বছর: "বিদ্যাজাত সম্পদ" উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক টেকঅফ
আট বছর পর শিক্ষা খাতের এই মেগা বিনিয়োগ সরাসরি দেশের জিডিপিতে রিটার্ন বা লভ্যাংশ দেওয়া শুরু করবে। ভৌত অবকাঠামোর অভাবকে ঢেকে দেবে ডিজিটাল ও বুদ্ধিবৃত্তিক সুপারস্ট্রাকচার।
১০ম বছর: স্বপ্নের "স্মার্ট ও শিক্ষাভিত্তিক বাংলাদেশ"
টানা ১০ বছর বাজেটের ৯০% শিক্ষায় ঢেলে দেওয়ার পর, বাংলাদেশ এক সম্পূর্ণ নতুন এবং অপরাজেয় রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এর ফলে, চরম দারিদ্র্যের হার প্রায় ১১% থেকে নেমে ০%-এ নেমে আসবে। জিডিপিতে বিদ্যাজাত সম্পদের অবদান এখন নামমাত্র, ১০ বছর পরে তা ৮০%-এ গিয়ে দাঁড়াতে পারে। যুব সমাজের সাক্ষরতা ও কারিগরি দক্ষতা এখন প্রায় ৭৫%, যা ১০০%-এ গিয়ে দাঁড়াতে পারে। গড় বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫% থেকে বেড়ে ১২% - ১৫% হতে পারে।
বাজেটের ৯০% শিক্ষা খাতে দেওয়া একটি চরমপন্থী এবং কাল্পনিক অর্থনৈতিক রূপরেখা হলেও, এর মূল বার্তাটি অত্যন্ত বাস্তব এবং চিরন্তন। প্রাকৃতিক সম্পদ বা ভৌত অবকাঠামো একদিন জরাজীর্ণ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু মানবসম্পদের মস্তিস্কে করা বিনিয়োগ কখনো মার খায় না। আমেরিকা কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো আজ বিশ্ব শাসন করছে কারণ তারা "বিদ্যাজাত সম্পদ" উৎপাদনে সফল হয়েছে। বাংলাদেশ যদি তার প্রথাগত মেগা প্রজেক্টের মোহ থেকে কিছুটা বের হয়ে শিক্ষা ও কারিগরি গবেষণায় তার সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করে, তবে আগামী এক দশকে দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ একটি অনন্য "স্মার্ট এশিয়ান টাইগার" হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে - এতে কোনো সন্দেহ নেই।
লেখকঃ মোহাম্মদ ফাছিহ-উল ইসলাম শাইয়্যান
লেখক পিরিচিতিঃ লিডারশীপ কোচ ও কলামিস্ট